ধূমপান আমাদের সমাজে একটি মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে পরিচিত। অনেকেই জানেন না যে ধূমপানের কারণে স্ট্রোক হয় এবং এটি মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ ধূমপানজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান। এই ব্লগে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব কীভাবে ধূমপান স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় এবং ধূমপান ছাড়ার উপকারিতা কী কী।
ধূমপান কী এবং এর মধ্যে কী কী ক্ষতিকর উপাদান থাকে?
ধূমপান হলো তামাক পোড়ানোর মাধ্যমে উৎপন্ন ধোঁয়া শ্বাসের সাথে গ্রহণ করার প্রক্রিয়া। সিগারেট, বিড়ি, হুক্কা বা অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের মধ্যে প্রায় ৭,০০০ এর বেশি রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যার মধ্যে অন্তত ৭০টি ক্যান্সার সৃষ্টিকারী।
ধূমপানে থাকা প্রধান ক্ষতিকর উপাদানগুলো হলো –
নিকোটিন এটি একটি অত্যন্ত আসক্তিকারক পদার্থ যা মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে এবং ধূমপানের অভ্যাস তৈরি করে। নিকোটিন রক্তনালীকে সংকুচিত করে এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি করে।
কার্বন মনোক্সাইড এই বিষাক্ত গ্যাস রক্তে অক্সিজেন বহনের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না।
টার এটি ফুসফুসে জমা হয় এবং শ্বাসনালীর ক্ষতি করে।
ফরমালডিহাইড, আর্সেনিক, সীসা, অ্যাম্মোনিয়া এবং আরও অনেক বিষাক্ত পদার্থ যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি করে।
ধূমপানের কারণে স্ট্রোক হয়? (বৈজ্ঞানিক কারণ)
স্ট্রোক হলো মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার একটি জরুরি অবস্থা। যখন মস্তিষ্কের কোনো অংশে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছায় না, তখন মস্তিষ্কের কোষগুলো মরতে শুরু করে। ধূমপানের কারণে স্ট্রোক হয় কারণ এটি একাধিক উপায়ে রক্তনালী এবং রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার ক্ষতি করে।
ধূমপান যেভাবে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় –
১. রক্তনালীতে প্লাক জমা (অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস)
ধূমপানের রাসায়নিক পদার্থগুলো রক্তনালীর ভেতরের দেয়ালে চর্বি, কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য পদার্থ জমতে সাহায্য করে। এই প্লাক জমার কারণে রক্তনালী সরু হয়ে যায় এবং রক্ত প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী ধমনীতে এই সমস্যা হলে স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
২. রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বৃদ্ধি
ধূমপান রক্তকে ঘন এবং জমাট বাঁধার প্রবণ করে তোলে। রক্ত জমাট বাঁধলে তা রক্তনালী বন্ধ করে দিতে পারে এবং মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে স্ট্রোক ঘটাতে পারে।
৩. উচ্চ রক্তচাপ
নিকোটিন হৃদস্পন্দন এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি করে। দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ রক্তচাপ রক্তনালীর ক্ষতি করে এবং স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি কারণ।
৪. রক্তনালীর প্রদাহ
ধূমপান রক্তনালীতে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা রক্তনালীর দেয়াল দুর্বল করে দেয়। এতে রক্তনালী ফেটে যাওয়ার (হেমোরেজিক স্ট্রোক) ঝুঁকি বাড়ে।
৫. HDL (ভালো কোলেস্টেরল) কমে যাওয়া
ধূমপান শরীরে ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ায়, যা হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে ধূমপায়ীদের স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে চারগুণ বেশি। যারা প্রতিদিন এক প্যাকেট বা তার বেশি সিগারেট পান করেন, তাদের ঝুঁকি আরও অনেক বেশি।
স্ট্রোকের প্রকারভেদ এবং ধূমপানের প্রভাব
স্ট্রোক মূলত দুই প্রকার –
ইস্কেমিক স্ট্রোক (Ischemic Stroke): এটি সবচেয়ে সাধারণ প্রকারের স্ট্রোক, যেখানে রক্ত জমাট বা প্লাকের কারণে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ধূমপান এই ধরনের স্ট্রোকের প্রধান ঝুঁকি কারণ।
হেমোরেজিক স্ট্রোক (Hemorrhagic Stroke): এই ধরনের স্ট্রোকে মস্তিষ্কের রক্তনালী ফেটে গিয়ে রক্তক্ষরণ হয়। ধূমপান উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তনালীর দুর্বলতা সৃষ্টি করে, যা হেমোরেজিক স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
উভয় প্রকারের স্ট্রোকেই ধূমপানের কারণে স্ট্রোক হয় এই সত্যটি প্রমাণিত এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্বীকৃত।
স্ট্রোকের লক্ষণসমূহ (দ্রুত চিনুন এবং সতর্ক হন)
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যত দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়, মস্তিষ্কের ক্ষতি তত কম হয়। স্ট্রোকের প্রধান লক্ষণগুলো মনে রাখার জন্য FAST পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়:
F (Face – মুখ): মুখের একপাশ ঝুলে পড়া বা অবশ হয়ে যাওয়া
A (Arms – হাত): একটি হাত উঁচু করতে না পারা বা দুর্বল লাগা
S (Speech – কথা): কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বলতে অসুবিধা
T (Time – সময়): এই লক্ষণগুলো দেখা মাত্র অবিলম্বে হাসপাতালে যেতে হবে
অন্যান্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, ভারসাম্য হারানো, এবং চেতনা হারানো।
ধূমপায়ীদের এই লক্ষণগুলো সম্পর্কে বিশেষভাবে সচেতন থাকা উচিত কারণ তারা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ধূমপান ছাড়ার উপকারিতা (শরীর ও মনের জন্য বিস্ময়কর পরিবর্তন)
ধূমপান ছাড়ার উপকারিতা অসংখ্য এবং প্রায় তাৎক্ষণিক। অনেকে মনে করেন দীর্ঘদিন ধূমপান করার পর ছেড়ে দিলেও কোনো লাভ নেই, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ধূমপান ছাড়ার সাথে সাথেই শরীর নিজেকে সারাতে শুরু করে।
ধূমপান ছাড়ার পর শরীরে যে পরিবর্তনগুলো ঘটে
২০ মিনিট পর: হৃদস্পন্দন এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
২ ঘণ্টা পর: রক্ত সঞ্চালন উন্নত হয় এবং হাত-পায়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়।
১২ ঘণ্টা পর: রক্তে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা স্বাভাবিক হয় এবং অক্সিজেনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
২-৩ সপ্তাহ পর: ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং শ্বাসকষ্ট কমে যায়।
১-৯ মাস পর: কাশি এবং শ্বাসকষ্ট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফুসফুসের সিলিয়া (ছোট লোম) পুনরায় কাজ করতে শুরু করে যা সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।
১ বছর পর: করোনারি হৃদরোগের ঝুঁকি ধূমপায়ীদের তুলনায় অর্ধেক হয়ে যায়।
৫ বছর পর: ধূমপান ত্যাগের পাঁচ বছর পর স্ট্রোকের ঝুঁকি অধূমপায়ীদের সমান হয়ে যায়।
১০ বছর পর: ফুসফুস ক্যান্সারের ঝুঁকি ধূমপায়ীদের তুলনায় অর্ধেক হয়ে যায়।
১৫ বছর পর: হৃদরোগের ঝুঁকি একজন অধূমপায়ীর সমান হয়ে যায়।
ধূমপান ছাড়ার অন্যান্য স্বাস্থ্য উপকারিতা
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো ছাড়াও ধূমপান ছাড়ার উপকারিতা আরও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় –
শ্বাসযন্ত্রের উন্নতি
ফুসফুসের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, শ্বাসকষ্ট কমে যায় এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসনালীর প্রদাহ (COPD) এর ঝুঁকি কমে।
হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস
হার্ট অ্যাটাক এবং অন্যান্য হৃদরোগের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
ক্যান্সারের ঝুঁকি কমা
শুধু ফুসফুস নয়, মুখ, গলা, খাদ্যনালী, মূত্রথলি, অগ্ন্যাশয় এবং অন্যান্য অঙ্গের ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস পায়।
প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি
পুরুষ ও মহিলা উভয়ের প্রজনন ক্ষমতা উন্নত হয়। গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে সুস্থ সন্তান জন্ম দেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
ত্বকের উন্নতি
ধূমপান ত্বকের বার্ধক্য বাড়ায় এবং বলিরেখা সৃষ্টি করে। ধূমপান ছাড়লে ত্বকের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং ত্বক আরও উজ্জ্বল ও সুস্থ হয়।
দাঁত ও মাড়ির স্বাস্থ্য
ধূমপান দাঁত হলুদ করে, মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে এবং মাড়ির রোগ বাড়ায়। ধূমপান ছাড়লে এই সমস্যাগুলো কমে যায়।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও সবল হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পায়।
আয়ু বৃদ্ধি
গবেষণায় দেখা গেছে যে ধূমপান ছেড়ে দিলে আয়ু ১০ বছর পর্যন্ত বাড়তে পারে।
আর্থিক এবং সামাজিক উপকারিতা
ধূমপান ছাড়ার উপকারিতা শুধু স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় –
আর্থিক সাশ্রয়
ধূমপানে প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকা খরচ হয়। এই অর্থ সঞ্চয় করে পরিবারের কল্যাণে বা অন্য কোনো ভালো কাজে ব্যবহার করা যায়।
সামাজিক সম্মান
ধূমপান ছেড়ে দিলে পরিবার ও বন্ধুদের কাছে সম্মান বৃদ্ধি পায়। অনেক স্থানে এখন ধূমপান নিষিদ্ধ, তাই ধূমপান ছাড়লে সামাজিক স্বাধীনতা বাড়ে।
পরিবারের সুরক্ষা
পরোক্ষ ধূমপান (সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোক) পরিবারের সদস্য, বিশেষ করে শিশুদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ধূমপান ছাড়লে পরিবারের সবাই সুস্থ থাকবে।
আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি
ধূমপানের মতো একটি কঠিন আসক্তি কাটিয়ে উঠতে পারা আত্মবিশ্বাস এবং আত্মসম্মান বাড়ায়।
ধূমপান ছাড়ার কার্যকর উপায় এবং কৌশল
ধূমপান ছাড়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। সঠিক পরিকল্পনা এবং দৃঢ় সংকল্প থাকলে যে কেউ এই আসক্তি কাটিয়ে উঠতে পারে। ধূমপানের কারণে স্ট্রোক হয় এবং অন্যান্য মারাত্মক রোগ হয়। এই সচেতনতা থাকলে ধূমপান ছাড়ার প্রেরণা পাওয়া সহজ হয়।
ধূমপান ছাড়ার কার্যকর পদ্ধতি –
১. দৃঢ় সংকল্প এবং কারণ নির্ধারণ: ধূমপান ছাড়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার নিজের দৃঢ় ইচ্ছা। কেন আপনি ধূমপান ছাড়তে চান তার কারণগুলো লিখে রাখুন – হতে পারে তা আপনার স্বাস্থ্য, পরিবার, সন্তান বা আর্থিক সাশ্রয়ের জন্য। যখনই ধূমপানের ইচ্ছা হবে, এই কারণগুলো মনে করুন।
২. ধূমপান ছাড়ার তারিখ নির্ধারণ: একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করুন যখন আপনি সম্পূর্ণভাবে ধূমপান ছেড়ে দেবেন। এই তারিখ এমন হওয়া উচিত যখন আপনার বিশেষ চাপ বা অনুষ্ঠান নেই। তারিখ নির্ধারণের পর আপনার পরিবার এবং বন্ধুদের জানান যাতে তারা আপনাকে সমর্থন করতে পারে।
৩. নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (NRT): নিকোটিন গাম, প্যাচ, লজেন্স বা ইনহেলার ব্যবহার করে ধূমপান ছাড়া সহজ হতে পারে। এগুলো শরীরে নিকোটিনের ঘাটতি পূরণ করে উইথড্রয়াল সিম্পটম কমায়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এগুলো ব্যবহার করা উচিত।
৪. ওষুধের সাহায্য: বুপ্রোপিয়ন এবং ভেরেনিক্লিন মতো ওষুধ ধূমপান ছাড়তে সাহায্য করে। এগুলো মস্তিষ্কে নিকোটিনের প্রভাব কমিয়ে আসক্তি কমায়। অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এগুলো সেবন করতে হবে।
৫. ট্রিগার চিহ্নিত করা এবং এড়িয়ে চলা: কোন পরিস্থিতিতে আপনার ধূমপানের ইচ্ছা বেশি হয় তা চিহ্নিত করুন। যেমন – চা/কফির সাথে, মানসিক চাপে, বন্ধুদের সাথে আড্ডায়, অ্যালকোহল পানের সময় ইত্যাদি। এই পরিস্থিতিগুলো যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন বা বিকল্প খুঁজে বের করুন।
৬. বিকল্প অভ্যাস তৈরি: ধূমপানের ইচ্ছা হলে অন্য কিছু করুন – হাঁটাহাঁটি করুন, গভীর শ্বাস নিন, পানি পান করুন, সুগার-ফ্রি গাম চিবান, ফল খান বা কোনো শখের কাজ করুন।
৭. ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন: নিয়মিত ব্যায়াম মানসিক চাপ কমায় এবং ধূমপানের ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। পুষ্টিকর খাবার খান এবং পর্যাপ্ত ঘুমান।
৮. সামাজিক সমর্থন: পরিবার, বন্ধু এবং সহকর্মীদের কাছে আপনার সিদ্ধান্তের কথা জানান। তাদের সমর্থন আপনাকে অনুপ্রাণিত রাখবে। ধূমপান ছাড়ার সাপোর্ট গ্রুপেও যুক্ত হতে পারেন।
৯. পেশাদার সাহায্য নেওয়া: ধূমপান ছাড়ার জন্য কাউন্সেলিং এবং থেরাপি অত্যন্ত কার্যকর। অনেক হাসপাতাল এবং ক্লিনিকে ধূমপান ছাড়ার প্রোগ্রাম রয়েছে।
১০. রিল্যাপস প্রতিরোধ: যদি কোনো সময় আবার ধূমপান করে ফেলেন, নিজেকে দোষী মনে করবেন না। এটি একটি শেখার অভিজ্ঞতা হিসেবে নিন এবং আবার চেষ্টা শুরু করুন। বেশিরভাগ মানুষ কয়েকবার চেষ্টা করার পর সফল হয়।
উইথড্রয়াল সিম্পটম এবং তা মোকাবেলা
ধূমপান ছাড়ার প্রথম কয়েক সপ্তাহ সবচেয়ে কঠিন কারণ শরীর নিকোটিনের অভাবে বিভিন্ন লক্ষণ প্রকাশ করে:
- তীব্র ধূমপানের ইচ্ছা
- বিরক্তি এবং রাগ
- উদ্বেগ এবং অস্থিরতা
- ঘনত্বের অভাব
- ঘুমের সমস্যা
- ক্ষুধা বৃদ্ধি এবং ওজন বাড়া
- মাথাব্যথা এবং ক্লান্তি
এই লক্ষণগুলো সাময়িক এবং ২-৪ সপ্তাহের মধ্যে কমে যায়। মনে রাখবেন, এই সামান্য অস্বস্তি ধূমপান ছাড়ার উপকারিতার তুলনায় কিছুই নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধূমপান এবং স্ট্রোক
বাংলাদেশে ধূমপানের হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে দেশের প্রায় ৩৫-৪০% পুরুষ এবং ২-৫% নারী ধূমপান করেন। গ্রামীণ এলাকায় বিড়ি এবং শহরে সিগারেট বেশি জনপ্রিয়।
বাংলাদেশে স্ট্রোক এখন অন্যতম প্রধান মৃত্যুর কারণ। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং এর একটি বড় কারণ হলো ধূমপান। দুঃখজনকভাবে, অনেকে জানেন না যে ধূমপানের কারণে স্ট্রোক হয় এবং এটি প্রতিরোধযোগ্য।
সরকার ধূমপান নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে যেমন পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধকরণ, সিগারেটের প্যাকেটে সতর্কতা চিত্র দেওয়া এবং তামাক পণ্যে কর বৃদ্ধি। তবে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ধূমপান ছাড়ার সুবিধা বাড়ানো এখনও প্রয়োজন।
যুবসমাজ এবং ধূমপান (ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করুন)
দুঃখজনকভাবে, অনেক তরুণ-তরুণী কৌতূহল, পিয়ার প্রেশার বা স্টাইল দেখাতে গিয়ে ধূমপান শুরু করে। তারা বুঝতে পারে না যে এই একটি সিদ্ধান্ত তাদের পুরো জীবন পাল্টে দিতে পারে।
অভিভাবক এবং শিক্ষকদের দায়িত্ব হলো তরুণদের ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কে শিক্ষিত করা। তাদের জানাতে হবে যে ধূমপানের কারণে স্ট্রোক হয়, ক্যান্সার হয়, হৃদরোগ হয় এবং জীবন সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়।
স্কুল কলেজে ধূমপান বিরোধী প্রচারণা চালানো উচিত। তরুণদের খেলাধুলা এবং সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করতে হবে যাতে তারা ধূমপানের মতো ক্ষতিকর অভ্যাসে জড়িয়ে না পড়ে।
মহিলাদের ধূমপান এবং বিশেষ ঝুঁকি
যদিও বাংলাদেশে মহিলাদের ধূমপানের হার পুরুষদের তুলনায় কম, তবে এটি ধীরে ধীরে বাড়ছে। মহিলাদের জন্য ধূমপানের ঝুঁকি আরও বেশি:
- মহিলাদের স্ট্রোকের ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় বেশি বাড়ে
- জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল এবং ধূমপানের সমন্বয় রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়
- গর্ভাবস্থায় ধূমপান শিশুর জন্মগত ত্রুটি, অকাল জন্ম এবং কম ওজনের কারণ
- মেনোপজের পর হৃদরোগ এবং অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি
মহিলাদের জন্য ধূমপান ছাড়ার উপকারিতা আরও বেশি কারণ এটি তাদের নিজের এবং তাদের সন্তানদের স্বাস্থ্য রক্ষা করে।
ধূমপান একটি নীরব ঘাতক
পরোক্ষ ধূমপান বা সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোক হলো অন্যের ধূমপানের ধোঁয়া শ্বাসের সাথে গ্রহণ করা। এটিও সরাসরি ধূমপানের মতোই ক্ষতিকর। পরিবারের যদি কেউ ধূমপান করেন, তাহলে অন্য সদস্যরা, বিশেষ করে শিশুরা ঝুঁকিতে থাকে।
পরোক্ষ ধূমপানের ফলে:
- শিশুদের শ্বাসনালীর সংক্রমণ, হাঁপানি এবং কানের সংক্রমণ বাড়ে
- অধূমপায়ীদেরও ফুসফুস ক্যান্সার এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে
- গর্ভবতী মায়েদের জটিলতা সৃষ্টি হয়
তাই নিজের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি প্রিয়জনদের রক্ষার জন্যও ধূমপান ছাড়া অপরিহার্য।
ধূমপানের জন্য আজকেই পদক্ষেপ নিন
এই বিস্তৃত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে ধূমপানের কারণে স্ট্রোক হয় এবং এটি একটি মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি। তবে সুসংবাদ হলো, যেকোনো সময় ধূমপান ছেড়ে দিলে ধূমপান ছাড়ার উপকারিতা পাওয়া সম্ভব।
আপনার বয়স যাই হোক, কতদিন ধরে ধূমপান করছেন তাতে কিছু আসে যায় না। মনে রাখবেন –
- ধূমপান আসক্তিমূলক কিন্তু অপ্রতিরোধ্য নয়
- লক্ষ লক্ষ মানুষ সফলভাবে ধূমপান ছেড়েছেন, আপনিও পারবেন
- প্রথম কয়েক সপ্তাহ কঠিন, কিন্তু এরপর সহজ হয়ে যায়
- পরিবার এবং বন্ধুদের সমর্থন নিন
- প্রয়োজনে ফিজিওথেরাপিস্ট ডাক্তারের সাহায্য নিতে দ্বিধা করবেন না
এই সত্যটি মাথায় রেখে আজই সিদ্ধান্ত নিন। আপনার জীবন মূল্যবান, আপনার পরিবার আপনাকে প্রয়োজন, এবং সুস্থ জীবন আপনার অধিকার। ধূমপান ছেড়ে দিন এবং ধূমপান ছাড়ার উপকারিতা উপভোগ করুন।
উত্তরা অথবা বনানী শাখার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিশ্চিত করতে, আপনি প্রতিদিন সকাল ৯:০০ টা থেকে রাত ৯:০০ টা পর্যন্ত +৮৮০১৭৭৪৬৭৮৬০৪ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।
আমাদের ফেইসবুক পেইজঃ পেইন কিউর
বিস্তারিত জানুন: মিনি স্ট্রোকের লক্ষণ, মিনি স্ট্রোক কেন হয় ও এটি হলে করণীয়
বিস্তারিত জানুন: হঠাৎ মাথা ব্যথা হওয়ার কারণ কি?
বিস্তারিত জানুন: সাইনাসের ব্যথা কমানোর উপায়
সাধারণ জিজ্ঞাসা
স্ট্রোকের পর ধূমপান করলে কি হয়?
স্ট্রোকের পর ধূমপান করা অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং পুনরায় স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। ধূমপান রক্তনালীগুলোকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ কমিয়ে দেয়, যা পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এছাড়া ধূমপান হৃদরোগ এবং অন্যান্য জটিলতার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি করে। স্ট্রোকের পর অবিলম্বে ধূমপান ত্যাগ করা সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু লাভের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিগারেট খেলে কি রক্ত দেওয়া যায়?
হ্যাঁ, ধূমপায়ীরা রক্ত দিতে পারেন, তবে কিছু শর্ত মেনে চলতে হয়। রক্তদানের ঠিক আগে অন্তত ২-৩ ঘণ্টা ধূমপান না করা উচিত, কারণ ধূমপানের পর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। যদিও ধূমপায়ীদের রক্ত গ্রহণযোগ্য, তবে দীর্ঘমেয়াদী ধূমপান রক্তের গুণমান কমিয়ে দেয় এবং কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা বাড়ায়। স্বাস্থ্যকর রক্তদানের জন্য এবং নিজের সুস্থতার জন্য ধূমপান ত্যাগ করাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
স্ট্রোকের পর ধূমপান করলে কি হয়?
স্ট্রোকের পর ধূমপান করা অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং পুনরায় স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি দ্বিগুণ বা তার বেশি বাড়িয়ে দেয়। ধূমপান মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে এবং রক্তনালীগুলোর আরও ক্ষতি করে। এটি রক্তচাপ বৃদ্ধি, রক্ত জমাট বাঁধা এবং হৃদরোগসহ অন্যান্য জটিলতার সম্ভাবনা বাড়ায়। স্ট্রোকের পর দ্রুত ধূমপান ছেড়ে দেওয়া রোগীর জীবনরক্ষা ও সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।

Dr. Saiful Islam, PT, is a Consultant Physiotherapist with expertise in Orthopedics. He holds a BPT from Dhaka University, an MPT, and a Postgraduate Certification in Acupuncture from India, with specialized training in Ozone Therapy. (Best physiotherapist in Dhaka)







